Saturday 1 December 2018

পাথর থেকে মানুষ?

পাথর থেকে মানুষ এলো?

আত্মা, পরমাত্মা এবং অতৃপ্ত আত্মা, এই তিন নিয়ে সর্বকালের সর্বদেশের রূপকথা এবং ধর্মের জগত্।
ঠিক কোন সময়টাকে জন্ম বলে সেটা মাথায় না রাখার কারণে মানুষের মনে আত্মা পরমাত্মা ইত্যাদি ধারণার উদ্ভব হয়েছে। মানুষের বাচ্চা মায়ের পেট থেকে বেরনোর আগে কি জ্যান্ত ছিল না? তারো আগে ভ্রূণটাও ছিল জ্যান্ত। তারো আগে জাইগোট, সেটাও তো মরা জিনিস নয়, তাতেও প্রাণ আছে। আর জাইগোট যে শুক্রাণু আর ডিম্বাণু দিয়ে তৈরী, তাতেও আছে প্রাণ। তারা বেরচ্ছেও জীবিত প্রাণীর শরীর থেকে। তাহলে আমরা জন্মালামটা ঠিক কখন, মরে তো কোনসময়ই ছিলাম না! আমরা গোড়া থেকেই জ্যান্ত, পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে না হোক, ক্ষণপদওয়ালা সেই আদিকোষের সময় থেকেই। আমাদের যে এই বাঁচার শক্তিটা, এটা প্রাণ থেকে প্রাণে বয়েই আসছে। জড়ে এ শক্তি নেই, আর চোখের সামনে কোন জড়বস্তুতে প্রাণসঞ্চার হতে দেখিও না। সুতরাং মানুষের মনে প্রাচীনকাল থেকেই ধারণা, প্রাণ একটা শক্তির মত, হতে পারে আত্মা, অথবা অন্য কিছু, যেটা একটা কোন বস্তু নয়, যেটা লৌকিক নয়, অলৌকিক।

বিজ্ঞানের চ্যালেঞ্জটা ঠিক যে এইখানে এই ধারণার সাথে লড়াইয়ে সেটা বললে একটু ভুল হবে, বিজ্ঞানের চ্যালেঞ্জ তার নিজের গতকালের ধারণার সাথেও। অবিশ্বাস হলে মনে করিয়ে দিতে হয় সেই পচা জিনিস থেকে স্বতস্ফূর্তভাবে মশামাছি উদ্ভবের তত্ত্বের কথা। জীবাণু বলে যে একটা জীব আছে, লুই পাস্তুর সেটা আবিষ্কার করে লোককে জানালে, বিজ্ঞান মেনে নিয়েছে রোগের পিছনে জীবাণুর কারসাজির ব্যাপারটা। ভাগ্যিস প্রচলিত ধর্মের মতো গোঁ বা ইগো, কোনোটাই বিজ্ঞানের নেই! সত্যের দিকে যাবার রাস্তাটা ঠিকঠাকভাবে খুঁজে বার করাতেই যেন তার যত আগ্রহ।

কিন্তু এরপরে রাস্তাটা ঠিক কোনদিক থেকে এসেছে তা জানতে গিয়ে বিজ্ঞান অনেকদূর ভেবে ফেলেছে। জড় পদার্থ তো গোড়া থেকেই ছিল এ গ্রহে। সেখান থেকে এলো কি করে জীবন, যাকে প্রাণশক্তি চালায়?

প্রাণ মানে এমন একটা সত্তা যা নিজে থেকে অন্য প্রাণের জন্ম দেয়, নিজেই নিজের জেরক্স অন্ততঃ বানাতে পারার ক্ষমতা তার থাকা চাই। সবথেকে ছোট যে অণুটার এরকম ক্ষমতা আছে মানুষে তার নাম দিয়েছে নিউক্লিক অ্যাসিড। প্রথমদিকের সেই দিনগুলোতে প্রাণহীন পৃথিবী হয়তো ভেবেছিল, জড়বস্তু থেকে কোনভাবে সেই অণুটার কোন অংশ তৈরী করতে পারলেই কেল্লাফতে! কিন্তু ঠিক কিভাবে তখনকার পরিবেশ সেটা বানাতে পারলো, সেটা আজও মানুষে সম্পূর্ণ বুঝে উঠতে পারে নি। বিভিন্ন পরীক্ষা থেকে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত পাওয়া গেছে এবং যাচ্ছে। জিগস্ পাজল্ সাজানোর মত করে আস্তে আস্তে অবশ্য স্পষ্ট হচ্ছে ছবিটা। সে তালিকায় সম্প্রতি নূতন সংযোজন আটলান্টিক সাগরের তলদেশ খুঁড়ে তুলে আনা তথ্যগুলো।

আটলান্টিক সাগর, পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মহাসাগর। দুহাজার সাল নাগাদ শুরু করে আজ অব্দি তার তলদেশে মানুষের তৈরী যন্ত্রপাতি অনেক উঁকিঝুঁকি মেরেছে। সমুদ্রের মেঝে তো আমাদের রাঙাকাকিমার গাল কিংবা ভূগোলের স্যারের টাকের মতো মসৃণ নয়, বরং পদিপিসিমার শীতকালের ফাটা গোড়ালির মত! ঐসব ফাটলদের ইংরেজিতে বলে ভেন্ট, ওর থেকে উঠে আসে পৃথিবীর গরম পেটের ভাপ। এরকম ফাটলওলা জায়গাকে ইংরেজিতে বলে হাইড্রোথার্মাল ফিল্ড। সারা পৃথিবীর সাগরের তলায় এরকম অনেক ফিল্ড আছে। বেশীরভাগ এইসব অঞ্চলে ডুবন্ত আগ্নেয়গিরি থাকে। কালো ধোঁয়ার মত গ্যাস বেরিয়ে আসে এইসব ফাটল থেকে, সালফার আর হাইড্রোজেন যার প্রধান উপাদান। চারপাশের জল গরম তো থাকেই, উপরন্তু ভালো মত অ্যাসিডিক হয়ে ওঠে।

আশ্চর্য্যের এই যে, মধ্য-আটলান্টিকের এই জায়গার ফাটলগুলো যেন আর সব ফাটলগুলোর মতো নয়। এরকম একটা আবিষ্কৃত জায়গার নাম মানুষে দিয়েছে লস্ট সিটি হাইড্রোথার্মাল ফিল্ড। এ জায়গা প্রায় দেড় থেকে দু মিলিয়ন বছরের বুড়ো জায়গা! জায়গা বলা হল বটে, তবে জায়গা না বলে জলের তলার এক বিরাট পাহাড়ের মাথা বললে ভুল হবে না। আসলে আটলান্টিক সাগরের যে সবচাইতে নীচু মেঝে, তার থেকে এই জায়গাটা 14000 ফুট উঁচুতে আছে। পাহাড়টার নাম দেয়া হয়েছে আটলান্টিস। সবটাই জলের নীচেকার ব্যাপার! আটলান্টিসের সবচাইতে উঁচু চূড়োটা সাগরের পিঠ থেকে 700 ফুট নীচে! পাহাড়টার 16 কিমি ছড়ানো মাথা, যেটার নাম লস্ট সিটি, সেখানে গোটা তিরিশেক নল আকারের চক বা ক্যালসিয়াম কার্বোনেটের স্তূপ আছে। চিমনির মত এইসব নল থেকে সবসময় মিথেন আর হাইড্রোজেন গ্যাস বেরোচ্ছে। এই অব্দি শুনে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে মিথেনের উত্স মরা জীবদেহ। কিন্তু রাসায়নিক বিশ্লেষণ অন্য কথা বলছে!

আটলান্টিস তৈরী হয়েছে আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম আর বালি দিয়ে তৈরী একরকম আগ্নেয় শিলা দিয়ে। একে বলা হয় পেরিডোটাইট। পেরিডোটাইটের সাথে সাগরের নোনা জল এক রাসায়নিক বিক্রিয়া করে মিথেন আর হাইড্রোজেন গ্যাস তৈরী করছে। না, কোন জৈবরাসায়নিক বিক্রিয়া নয়, নিখাদ ভৌতরসায়ন! মিথেনের মত হাইড্রোকার্বন তৈরী হবার সাথে সাথে সৃষ্টি হচ্ছে আরো অন্যান্য হাইড্রোকার্বন, অ্যামোনিয়া, এবং বিভিন্ন অ্যামোনিয়া পরবর্তী রাসায়নিক অণু, যেমন ফরমামাইড ইত্যাদি। এগুলো যেহেতু ক্ষারীয় চরিত্রের, তাই আশেপাশের গরম জল অবধারিত ভাবে ভালোমত ক্ষারীয় (pH 9 থেকে 11), যেটা সাগরের তলায় বিরল ঘটনা!

ফ্রান্সের বিজ্ঞানী বেনেডিক্ট মেনেজ আর তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গো মিলে সাংঘাতিক সব তথ্য সংগ্রহ করে চলেছেন সেইসব জায়গার জলের নমুনা পরীক্ষা করে। লস্ট সিটি অঞ্চলের সাগরের মেঝে ফুটো করেও 170 মিটার নীচে নেমে গেছে তাঁদের যন্ত্র। তুলে এনেছে জলকাদার নমুনা। সেসব দেখেশুনে যন্ত্রে বলছে, সেখানে ট্রিপ্টোফ্যান নামে এক অ্যামিনো অ্যাসিড রয়েছে। অ্যামিনো অ্যাসিড জুড়ে জুড়ে প্রোটিন তৈরী হয় সবাই জানে। ওখানে জনপ্রাণী নেই, তার পচা অংশ নেই, তো ট্রিপ্টোফ্যান এলো কোত্থেকে? ল্যাবরেটরিতে ইন্ডোল নামে একরকমের জৈবযৌগ থেকে ট্রিপ্টোফ্যান তৈরী করা যায় এবং তাতে কোন প্রাণীর সাহায্য লাগে না, তো দেখা যাক ঐ নমুনাতে এরকম ইন্ডোল অণু আছে কি না? যন্ত্র পরীক্ষা করে বলে দিল, আজ্ঞে হ্যাঁ। ইন্ডোল আছে, এবং কোন জৈব সাহায্য ছাড়াই ট্রিপ্টোফ্যান ঐখানে তৈরী হয়েছে। কোনভাবে পেরিডোটাইট আর নোনা জল মিলেই কার্বন, নাইট্রোজেন আর হাইড্রোজেন দিয়ে তৈরী ইন্ডোল অণু হয়েছে। ইন্ডোল থেকে ট্রিপ্টোফ্যান তৈরীর রাস্তায় অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে সম্ভবত স্যাপোনাইট নামে একরকম পাললিক শিলা।

ইন্ডোল আর ট্রিপ্টোফ্যান-এর এই অজৈব উত্পত্তিলাভের পরে ডিএনএ বা আরএনএ-এর অন্যান্য উপাদানগুলোর সৃষ্টি হওয়া আশ্চর্য্যের কিছু নয়। আর তার থেকে জেনেটিক পদার্থের তৈরী হওয়াটাও কল্পসাধ্য কিছু নয়, হতেই পারে। অন্ততঃ পরিবেশ যেমনি ক্ষারীয় এবং বিজারণের উপযোগী তাতে করে জীবনের সাহায্য ছাড়াই নাইট্রোজেন গ্যাস থেকে অ্যামোনিয়া সৃষ্টির থিওরি একদম উড়িয়ে দেবার মতো নয়। কি করে অ্যামোনিয়া পৃথিবীতে, ঐ পরিবেশে, সাগরের জলে তৈরী হয়েছিল, প্রথমবারের জন্য, তা আজো রহস্যে ঢাকা! 2018 এর নভেম্বরে নেচার পত্রিকায় প্রকাশিত এই রিপোর্টটিই আপাতত স্রেফ পাথুরে জড় থেকে জৈব যৌগ এবং অ্যামোনিয়া উত্পত্তির সর্বশেষ সম্ভাব্য খতিয়ান (https://www.nature.com/articles/s41586-018-0684-z)।

জীবনের শুরু তাহলে আত্মা থেকে আত্মায় হয়তো নয়, পৃথিবীর সাগরের তলার পাথুরে জমি থেকে যাত্রাটা শুরু হয়েছিল, আর আপাতত যাঁর হাতে এই কাগজটি ধরা আছে, সেই প্রাণীটির জাতি অব্দি সেই প্রাণ ভ্রমণ করেছে মাত্র! আসলে, আমাদের সকলেরই জন্মদিন ঐ সময়টা, স্থান, ঐখানে।

© শ্রুতিসৌরভ বন্দ্যোপাধ্যায়

Monday 8 October 2018

নিয়ন্ত্রিত বিবর্তনঃ রসায়ন নোবেল ২০১৮, ১ম ভাগ


নিয়ন্ত্রিত বিবর্তনঃ রসায়ন নোবেল ২০১৮, ১ম ভাগ

১.
জীবন যেদিকে বয় সেইদিকে গেলে,
ইভোলিউশান ঘটে, পুস্তকে মেলে!
সাড়ে তিন বিলিয়ন বছরেরো আগে,
জলের ভেতরে প্রাণচিহ্নেরা জাগে,
এক প্রাণ থেকে আসে অন্য সে প্রাণে,
এককোষ, বহু হয়, জেনেটিক দানে
নূতনেরা তোলে ঝড়, পুরোনো পালায়,
যোগ্যরা টিকে থাকে, পাল্টে চালায়
জীবনের সংগ্রাম, লেখা থাকে জিনে,
প্রকৃতি সুবিধা মতো তাকে নেয় চিনে।
যে জীব যে পরিবেশে টিকে থাকে বেঁচে,
সেটার চাহিদা বুঝে প্রোটিন এনেচে
DNAরা, প্রকৃতির কন্ট্রোল করা
বিবর্তনের খেলা, জিন বুঝে গড়া
হলো কতো প্রোটিনের বড়ো বড়ো অণু,
তার রসায়ন সৃজে দনু থেকে মনু।

২.
কোষের ভেতরে থাকে নিউক্লিয়াস, এ তো
সকলেই পড়েছেন, তার ভেতরে তো
DNA প্যাঁচালো যেন মালগাড়ী চলে,
এক এক কামরা তার, তাকে জিন বলে!
সেই জিনে থাকা কোড নির্দেশ দিলে
প্রোটিন গঠিত হয়, ইঁটে ইঁটে মিলে।
কুড়িয়ে বাড়িয়ে কুড়ি রকমের ইঁটে,
ঘেঁটেঘুঁটে দেঁড়েমুশে জটিলতা গিঁটে!
এনজাইমের অণু এমনই আসলে,
বিক্রিয়া তাড়াতাড়ি হয় তার কোলে!
কারো কোলে এটা ঘটে, কারো কোলে ওটা,
যার যার নিজ কাজ, না গুলিয়ে ছোটা।
কোষ থেকে বার করা উত্সেচকেরা,
ল্যাবেতেও সাকসেসফুল হয় এরা,
নামী দামী বিক্রিয়া সহজে ও দ্রুত
হয়ে যায়, প্রোডাক্টে থাকে না তো খুঁত-ও!

৩.
রোজকার কাজে লাগা জিনিস বানাতে
এনজাইমেরা যদি হেল্প করে হাতে,
দূষণ তো কম হয়, সম্পদও বাঁচে,
কেমিস্টকে শিরে তুলে দুনিয়াটা নাচে!
প্রকৃতির একটুকু না করেও ক্ষতি,
রসায়নশিল্পকে দেয়া যায় গতি।
মুশকিল একটাই: এনজাইমেরা,
কী করবে, করবে না, ঠিক করে এরা
নিজেরাই, মানুষের হাত নেই তাতে,
পণ্ডিতে ভেবে মরে, দিনে আর রাতে।
কাজের উত্সেচক--- মনমতো ভাবে,
তৈরী করার হ্যাপা, কে বা সামলাবে?
কুড়ি রকমের ইঁটে হাজারে হাজারে
কম্বিনেশান হয়, তাদের সাজা রে,
তার পরে যদি কিছু এনার্জি বাঁচে,
টেস্ট করে দেখা যাবে, কপালে কী নাচে!

৪.
ঊনিশশো আশি হ’তে ইউ এস এ-বাসী
ফ্রান্সিস আর্নল্ড, বড়ো প্রত্যাশী,
খোদার উপরে খোদকারী করা নেশা,
দিনরাত এক করা, গবেষণা পেশা।
ভেবেছেন এরকমই অনেকের আগে,
আইডিয়া ডুবে যায়, আইডিয়া জাগে!
উত্সেচকের সংশ্লেষ ছেড়ে যদি
কপি করে ফেলা যায় সময়ের নদী
যেমনটা প্রকৃতিতে প্রোটিন বানায়,
নূতন নূতন সব, তেমনটা প্রায়,
প্রকৃতি বানিয়ে দেন প্রোটিনের অণু,
কি প্রোটিন হবে সেটা কোড করে হনু
জিনগুলো, আর যদি সেই জিন ধরে,
বদলিয়ে দেয়া যায়, ল্যাবে কিছু করে,
জেনে রেখো তাকে বলে মিউট্যান্ট জিন,
ওর থেকে জন্মাবে অন্য প্রোটিন।

৫.
এইভাবে আর্নল্ড এগিয়ে গেছেন,
মিউট্যান্ট জিন করে, তাকে পুরেছেন
ব্যাকটিরিয়ার কোষে, সেই কোষে এসে,
জিন তার কোড বুঝে নিয়ে সংশ্লেষে
এনজাইমের মেলা, আনকোরা যত,
তার থেকে বেছে নেয়া হলো মনমতো,
এনজাইমের অণু, সেরকম দেখে,
যাকে দিয়ে কাজ চলে সব দিক রেখে।

ওষুধ, জ্বালানী, আর বিকল্প খানা,
পরিধান বস্ত্র, কী থাকার ঠিকানা,
এসবের যত অণু তাদের বানাতে,
ভারী ধাতু, বিষ গ্যাস, বাদ যায় যাতে,
ভয়ানক অ্যাসিডের সাহায্য ছাড়া,
মানুষ বানাতে চায় নূতন এক ধারা,
সেই ধারা শুরু হয়েছিলো যাঁর হাতে,
পৃথিবী চাইলো তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে।

**********
যে যুগে বিবর্তন, ল্যাবে হলো শুরু
ফ্রান্সিস আর্নল্ড, সে যুগের গুরু।

© শ্রুতিসৌরভ বন্দ্যোপাধ্যায়

Monday 3 September 2018

ল্যাক্টোব্যাসিলাসের স্বপ্নবিলাস

ল্যাক্টোব্যাসিলাসের স্বপ্নবিলাস

ঢোলগোবিন্দবাবু, বলি ও ঢোলগোবিন্দবাবু, আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন?

ঢোলগোবিন্দবাবু বেজার মুখে গালে হাত দিয়ে বসে ভাবছেন, এটা কি করে হয়! নামী কোম্পানির সতেরো টাকার ডাবল টোনড দুধ শেষে পচা বেরলো আর গিন্নি তাই দেখে রেগে তাঁকে কি না কি গাল দিলেন! এমনিতে সুরোবালার রাগটা একটু বেশী, বাজারের জিনিস পচা বেরলে প্রায়ই গাল দেন প্রাণনাথকে, কিন্তু আজকে একেবারে প্রেস্টিজ তো দূর হকিন্স অব্দি পাংচার হয়ে গেছে, গাল খাওয়ার ব্যাপারটা পাশের বাড়ীর মাতাল বুড়োটাও দেখেশুনে ফেলেছে, এটা ভারী লজ্জার ব্যাপার। এরকম ভাবে বেঁচে থেকে লাভ কী?

ঢোলগোবিন্দবাবু, বলি ও ঢোলগোবিন্দবাবু, আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন?

এই দুঃসময়ে আবার কে ডাকে রে? ঢোলগোবিন্দবাবু দেখলেন একটা খুব সিড়িঙ্গে চেহারার কী একটা জন্তু না হাসি না কান্না মুখ করে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে, আবার বললো সেটা, আমার কথা এবার নিশ্চয় শুনতে পাচ্ছেন? আপনার চশমার লেন্সের পাওয়ার বাড়িয়ে ওটাকে মাইক্রোস্কোপ বানিয়ে দিয়েছি, সবই লুইবাবার কৃপা, তাই এখন আপনি আমায় দেখতে পাচ্ছেন। কি আর বলবো ঢোলগোবিন্দবাবু, আমাদের খিদে পেয়েছিল, তাই আপনার সতেরো টাকার দুধে মুখ দিয়েছি, তাতেই দুধ গেছে খারাপ হয়ে! ওই “বেশী দুধ কম পানি” কোম্পানির লোকগুলো আসলে দুধটা ভালো করে পাস্তুরাইজ করতে পারে নি, তাই আমরাও বেঁচে গেছিলাম। সেইজন্য আপনি গিন্নির ঝাঁটা থেকে বাঁচলেন না! আমি ব্যাকটেরিয়া। দুধের ব্যাকটেরিয়া।

দাঁত মুখ খিচিয়ে ঢোলগোবিন্দ বলে ওঠেন, তা তুমি ব্যাকা না টেরা তা জেনে আমি কি করবো বলতে পারো? আমার তো গোটা জীবনটাই ব্যাকাট্যারা হয়ে আছে, একটা সোজা লোক পেলুম না আজ অব্দি, সবাই ঠকিয়ে গেল!

ব্যাকটেরিয়া বললে, আমাদের আদিগুরু বলতেন, মানে যিনি আমাদের আবিষ্কার করেছিলেন আবার বিনাশের রাস্তাও বাতলে দিয়ে গেছিলেন আপনাদের, সেই লুইবাবা, বলতেন, মন তৈরী থাকলে সঠিক সুযোগ আসে, আপনার মন এই এদ্দিনে বোধহয় তৈরী হয়েচে!

ঢোলগোবিন্দ নড়েচড়ে বসেন, বললেন, তা বাবা ব্যাকটেরিয়া, তোমাকে বাকু বলেই ডাকছি, কিছু মনে কোর না যেন, বলি এই লুইবাবাটি কে? যদি সম্ভব হয় আমায় একটিবার নিয়ে যাবে তাঁর কাছে? এ ভবসংসার বড়ো নির্মম, আমায় ডাবল টোনড মায় পাস্তুরাইজড করে ছাড়বে মনে হয়!

বাকু বললে, এমনিতে জাতিতে আমরা ল্যাক্টোব্যাসিলাস, কাজেই লাকু বলেও ডাকতে পারেন। সে যাই হোক, দেড়শো বছর আগেও কেউ আমাদের পাত্তা দিত না, বলা ভাল, জানতো না। তারপর এই লুই ঠাকুর এলেন, আর আপনাদের ভালো ছেলের আর মন্দ ছেলের খাবার কেন পচে যায় তার রহস্য বার করলেন!

ভালো ছেলের মন্দ ছেলের খাবার? ঢোলবাবুর চোখ বড়োবড়ো হয়ে যায়।

বাকু কিংবা লাকু তার সিলিয়াগুলো ফ্ল্যাজেল্লায় ঠেকিয়ে অনেকটা প্রণাম ঠোকার মত করে বলে, আহা, ওই যে দুগ্ধ আর মদ্য।

ঢোলগোবিন্দ বললেন, ও এই ব্যাপার! যেমন আমি আর পাশের বাড়ীর মাতাল বুড়োটা!

বাকু বললো, সে আপনি যাই-ই বলুন, ভালো মন্দ কেউ টিকতো না যদি না লুই ঠাকুর আমাদের খুঁজে বার করে দেখাতেন। সেই জন্যই উনি আমাদের আদিগুরু। একদিন সকালে উঠে আমার পূর্বাণুজীবরা দেখে, আমাদের কলোনি কে কলোনি এক্সপোজড হয়ে গেছে। সবাই আঙুল তুলে বলছে, এরাই পচায় এরাই পচায়। লুই ঠাকুর আমাদের যেমনি বিখ্যাত করে গেলেন, তেমনি করলেন কুখ্যাতও।

ঢোলবাবু বললেন, খুবই দুঃখের কথা, কিন্তু আমায় এভাবে না ফাঁসালে চলছিল না তোমাদের? পচালে পচালে আমার দুধের প্যাকেটে ঢুকে পচালে?

বাকু বললো, এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ দোষ যারা পাস্তুরাইজেশন করছিল, তাদের! ওরা যদি পঞ্চাশে ফোটাতো তো আমরা ফুটে যেতাম, ফোটায় নি, তাই মওকা পেয়ে ফুটিয়ে দিয়েছি আমরা! আমরা আমাদের কাজ করেছি, কাক্কা!

এই বলে বাকু তার সিলিয়াগুলো ঝাঁকায়, অনেকটা কাঁধনাচানোর মত আর কী!

ঢোলবাবু বললেন, তা লুইঠাকুরের ব্যাপারটা…

বাকু বললো, ব্যাপারটা গোটা না জানলে ঠাকুরের শরণাপন্ন হওয়া যাবে না। পুরো নাম লুই পাস্তুর। বাবা বলতেন, চান্স ফেভারস্ দ্য প্রিপেয়ার্ড মাইন্ড!

ঢোলবাবু বললেন, দাঁড়াও দাঁড়াও, নামটা চেনা চেনা লাগছে। আরে এতো বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর, দস্তুরমতো চিনি। ওই জন্য একে বাবা মানে আদিগুরু বলছো বুঝি। আমার মেয়ে টেঁপির বইতে লেখা আছে, তিনি হলেন জীবাণুবিদ্যার বাপ! ইনিই তো পাস্তুরাইজেশন পদ্ধতি আবিষ্কার করে বিখ্যাত। জলাতঙ্কের টিকে আবিষ্কারও এনার কাজ। সংসারে টিকে থাকার টিকেও কি ইনি আবিষ্কার করে গেছেন, বাবা ল্যাক্টোব্যাসিলাস?

বাকু বললো, তা যদি মনে করেন, অনেকটা সেইরকম, নিজের কাজ দিয়ে দেখিয়ে গেছেন, কিন্তু সে আরেক কাহিনী।

ঢোলগোবিন্দ বলেন, আহা, তাই বলো না, একটু শুনি, শুনেও পুণ্য।

বাকু বলে, সে প্রায় একশো সত্তর বছর আগের ঘটনা। ফ্রান্সদেশের লুইঠাকুর তখন ওই চব্বিশ বছরের তাজা ছেলে, শিল্পীর মত মন আর বিজ্ঞানীর মত বুদ্ধি। লিথোগ্রাফি মানে জানেন তো, নরম পাথরের উপরে ছুঁচালো জিনিস দিয়ে আঁকিবুকি কেটে রঙ চাপিয়ে, তার উপর কাগজ চাপা দিয়ে, গোটা ছবিটার একটা আয়নার মত প্রতিরূপ তৈরী করা, এসবে লুইঠাকুরের হেভি উত্সাহ। এমনি সময়েই ঘটলো সেই ব্যাপারটা, যেটা থেকে আপনি জীবনে টিকে থাকার শিক্ষে পাবেন, ঢোলবাবু।

আঙুর থেকে বেরোয় যে রস, সে রস গেঁজিয়ে হয় উচ্চমানের যতরকম ওয়াইন মদ্য। এটা পুরোপুরি আমাদের ক্রেডিট, মানে ব্যাকটেরিয়াদের, আমরা পচাই, তাই দাম বাড়ে মদের। যত ভালোভাবে পচে, তত ভালো মানের অ্যালকোহল বেরিয়ে আসে দ্রাক্ষাশর্করার রাসায়নিক বিবর্তনে।

ভালোজাতের ওয়াইনের ছিপির ভিতরের গায়ে দেখবেন লেগে থাকে চকচকে একরকমের গুঁড়ো। ওটা হল টার্টারিক অ্যাসিডের লবণ, কেলাসাকার কিনা, তাই চকচক করে আলো পড়লে। আঙুর সত্যিই খানিকটা টক, শেয়ালে বলুক কি না বলুক, এর জন্য দায়ী তাতে থাকা টার্টারিক অ্যাসিড। আঙুর থেকে তৈরী মদ মানে অ্যালকোহলেও এই অ্যাসিডের পটাসিয়াম বা সোডিয়াম লবণ, যাদের টার্ট্রেট বলে, তারা গুলে ডুবে থাকে। অ্যালকোহল বাষ্পীভূত হতে থাকলে টার্ট্রেট কেলাসগুলো জমতে থাকে ছিপির ভিতরের গায়ে। বার্লিনের বিশ্ববিখ্যাত কেমিস্ট মিতসার্লিখ এবং আরো অনেকে এই টার্ট্রেটের লবণ আলাদা করে দ্রবণ বানালেন আর তার মধ্য দিয়ে সমতল সমবর্তিত আলো পাঠিয়ে দেখলেন…

ঢোলবাবু বললেন, কি আলো? সমাবর্তন টমাবর্তন আবার কি হে? আলো কি ডিগ্রি পেল না কি রাষ্ট্রপতির হাত থেকে?

বাকু বললো, আহা, কাকা একটুও বিজ্ঞানের খোঁজ রাখেন না দেখছি! সমাবর্তন নয়, সমবর্তন, ইনজিরিতে যাকে বলে পোলারাইজেশন। কেন, পোলারাইজড সানগ্লাস পরেন নি বুঝি? পোলারাইজেশন মানে হলো পোলারাইজ করা, মানে…

ঢোলবাবু বলেন, ও বুয়েছি, মানে যাকে বলে মেরুকরণ। মানে অনেকরকম মতামতকে ঝানু  রাজনীতিকরা কাজের সুবিধার জন্য দুই মেরুতে বিভাজিত করে হিসেব করে, তুই এ দিক আর তুই ও দিক, এই তো!

বাকু বললো, এটা খুব দামী কথা বলেছেন কাকা। এমনিতে যে আলো আমরা চারদিকে দেখি, সেটা কেমন যেন ছড়ানো ছেটানো, যাকে বলে স্ক্যাটার্ড লাইট। পুরীর সমুদ্রের ঢেউ যদি আপনি সামনে থেকে দেখেন তো দেখবেন ঢেউটা সমুদ্রতলের উপরে উঠছে আর নীচে নামছে, কিন্তু একটা সমুদ্রতলেই সেটা ঘটছে। সমুদ্রতল যেমন একটা, সাধারণ আলোতে তেমনি তল একটা নয়, অসংখ্য। ওমনি অসংখ্য তলে আলোর ঢেউ উপরে উঠে আর নীচে নেমে ছুটে চলেছে!

ঢোলবাবু বললেন, সে কি! সবদিকে সমুদ্র! কল্পনা করতেই ভয় লাগছে বাকু!

বাকু বললো, এর থেকেও ভয়ানক শয়তান কিছু অণু আছে কাকা, যারা এই সাধারণ আলোর ঢেউগুলোকে পোলারাইজ করে ফেলে। এরা থাকে প্রাকৃতিক কিছু কেলাসে, মানুষ তাদের নিয়ে একরকমের হুজুগে মেতে উঠেছিল সে সময়। তো এইসব অণুরা এমনভাবে কেলাসের ভেতরে থাকে যে, সাধারণ আলো যখন কেলাসের ভেতর দিয়ে পাঠানো হয় তখন একটা তলের আলোর ঢেউ বাদ দিয়ে বাকি সমস্ত তলের আলোর ঢেউ এরা শুষে ফেলে! জাস্ট ভাবো, আলোটা যখন ওইসব কেলাস থেকে বেরোয়, তখন দেখা যায়, স্রেফ একটা তলে আলোর ঢেউটা নাচছে, ঠিক সমুদ্রের ঢেউগুলোর মত। ওইরকম একতলে নাচা আলোকে বলে সমতল সমবর্তিত আলো। ঝানু রাজনীতিকদের মত কেলাসগুলো সাধারণ আলোর ঢেউগুলোকে দুটো ভাগে ভাগ করে ফেলেছে, একভাগকে শুষে নিয়েছে, বেরতে দেয় নি, অন্যভাগকে বেরতে দিয়েছে সমবর্তনের পরে। তুই ভেতরে, তুই বাইরে! ঠিক যেন ফিল্টার, তাই এইরকম কেলাসগুলোকে বলে পোলারাইজিং ফিল্টার। আপনার মেয়ে টেঁপি ওই যে সেদিন সাড়ে ছ হাজার টাকা দামের যে সানগ্লাসটা কিনলো, তার কাচেও ওইরকম ফিল্টার আছে।

ঢোলবাবু খানিক ঢোক গিলে বললেন, টেঁপির বন্ধু খ্যাঁদা ভালো চাকরি করে, ওই ভ্যালেন্টাইন গিফ্ট দিয়েছিল, তাতে তোমার কী? তুমি বলো, তারপর?

বাকু সিলিয়া ঝাঁকিয়ে বললো, না না, আমি সামান্য ব্যাকটেরিয়া, আমার আর কি! তো হয়েছে কি, সমতল সমবর্তিত আলো নিয়ে তখন বিজ্ঞানীমহলে দারুণ উদ্দীপনা। প্রাকৃতিক অনেক রকম পদার্থের দ্রবণের মধ্য দিয়ে তখন এই আলো পাঠিয়ে দেখা হচ্ছে কি হয়। যা দিয়ে দেখা হচ্ছে সেটাও একইরকম একটা ফিল্টার, যেটা ওই সমতল সমবর্তিত আলো তৈরী করেছিল। তার মানে ওই দ্বিতীয় ফিল্টারের ভেতর দিয়ে সমবর্তিত আলো বেরিয়ে যাবারই কথা। অন্যভাবে বললে প্রথম ফিল্টার যে আলোকে সমবর্তিত করে বেরনোর পারমিশন দিয়েছে, দ্বিতীয় ফিল্টারও সেটাকে ওইভাবেই বেরতে দেবে। দুই ফিল্টারের মাঝে কিছু না রাখলে সেরকমই ঘটলো। কিন্তু যেই দুটোর মাঝে রাখা হল দ্রবণভর্তি পাত্র, ওমা, সে কি কান্ড! এ পাশ দিয়ে সমতল সমবর্তিত আলো দ্রবণের ভেতরে পাঠিয়ে ওপাশ থেকে আলোটাকে দ্বিতীয় ফিল্টার দিয়ে দেখতে যাবে, দেখে আলো নেই, মানে ভ্যানিশ!

ঢোলগোবিন্দ বললেন, নেই মানে, সব খেয়ে নিল নাকি? আমি হলে যেটা দিয়ে দেখছি সেটা এদিক ওদিক নেড়েচেড়ে দেখতাম।

বাকু বলে, দূর মশাই, পন্ডিতগুলো সেইরকম ভাবে নি নাকি ভাবছেন! তখনই তো কেউ কেউ ডানদিকে সরিয়ে আর কেউ কেউ বাঁ দিকে দ্বিতীয় ফিল্টারটাকে ঘুরিয়ে আলোটা ফের দেখতে পেল। তার মানে যে সমতলে আলোটা সমবর্তিত করেছিল প্রথম ফিল্টার, দ্রবণ সেই সমতলকে ডাইনে বা বাঁয়ে ঘুরিয়ে দিয়েছে। আলোর ঢেউ এখন সেই ঘুরে আসা নূতন সমতলে নাচছে, তাই দ্বিতীয় ফিল্টারকে ডানদিক বাঁদিক না ঘোরালে সেই আলো দেখা যাবে না।

দেখা গেল একশ্রেণীর পদার্থের দ্রবণ সমতলকে ডানদিকে ঘোরাচ্ছে। তাদের বলা হল দক্ষিণাবর্তী বা ডেক্সট্রোরোটেটরি। আর একরকম দ্রবণ তাকে বাঁদিকে ঘোরাচ্ছে। তাদের বলা হল বামাবর্তী বা লেভোরোটেটরি। আর এইরকম সমতল ঘুরিয়ে দেওয়ার মত মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া ঘটনাকে বলা হতে লাগলো---আলোকীয় ঘূর্ণন বা অপটিক্যাল রোটেশন। কে কত ডিগ্রি বামাবর্তী আর দক্ষিণাবর্তী সেটা মাপারও ব্যবস্থা থাকলো। এই গোটা যন্ত্রটা, মানে দুটো ফিল্টারের মাঝে দ্রবণ রাখার পাত্র নিয়ে এই ব্যবস্থাটার নাম দেওয়া হয়েছিল পোলারিমিটার।

ঢোলবাবু বললেন, অ! মিতসার্লিখ তারমানে এই পোলারিমিটারে টার্ট্রেট লবণের আলোকীয় ঘূর্ণন মাপছিলেন?

বাকু বললে, আরিব্বাস, কাকার তো দেখছি অডিওগ্রাফিক মেমোরি, কত জিবি? আহা, চটেন না, ঠিকই ধরেছেন, মদের ভাটির দেয়ালে আর বোতলের ছিপির ভেতরের গায়ে জমে থাকা টার্ট্রেট লবণ, দেখা গেল পোলারাইজড আলোর সমতলকে ডানদিকে ঘোরাচ্ছে। একে বলা হল আলোকসক্রিয় বা অপটিক্যালি অ্যাকটিভ টার্ট্রেট। মুশকিল হল, ল্যাবরেটরিতে রাসায়নিক বিক্রিয়া করে তৈরী করা টার্ট্রেট বা টার্টারিক অ্যাসিড এরকম কিছুই দেখাচ্ছে না, না ডানদিকে না বাঁদিকে ঘোরাচ্ছে সমতলটাকে। তার মানে এটা হল আলোকনিষ্ক্রিয় টার্ট্রেট লবণ। আঙুরের থোকার ল্যাটিন নাম ছিল রেসিমাস। তার সাথে মিল রেখে একে বলা হল রেসিমিক লবণ।

পন্ডিতেরা পরীক্ষা করে দেখলেন, আলোকসক্রিয় বা আলোকনিষ্ক্রিয়, দুরকমের লবণের রাসায়নিক ধর্ম হুবহু এক। তাহলে কী রহস্যে একটা আলোকসক্রিয় আর একটা আলোকনিষ্ক্রিয়? ইউরোপ জুড়ে করা হল ঘোষণা, ওপেন চ্যালেঞ্জ, যিনি পারবেন তিনি এগিয়ে আসুন এ রহস্যের সমাধানে।

বছর চব্বিশ পঁচিশের সদ্য পিএইচডি, তরুণ সহকারী অধ্যাপক, লুই পাস্তুর যখন প্যারিসের অ্যাকাডেমি অফ সায়ান্সে গবেষণা পত্র পেশ করে ঘোষণা করেন, তিনি পেরেছেন এ রহস্যের সমাধান করতে, তখন সবাই হাঁ হয়ে গেল। আহা, লুইবাবাকে তখন কী সুন্দরই না দেখতে, ঠিক যেন আপনাদের দেশের হিন্দি সিনেমার কে কে মেনন! (কাকা, ছবিটা দেখুন লেখার নীচে) তো সে যাই হোক, প্যারিসের অখ্যাত তরুণ গবেষক পেরেছেন বার্লিনের বিখ্যাত কেমিস্টের ধাঁধার জবাব দিতে! আরো আশ্চর্য হলো, যখন তারা শুনলো, এ কাজে পাস্তুর ব্যবহার করেছেন একটা মাইক্রোস্কোপ, যা কিনা তখনকার দিনে বায়োলজিস্টরাই ব্যবহার করে থাকেন! রসায়নের কাজে অণুবীক্ষণ যন্ত্র? হাঃ হাঃ হাঃ, অণুদের পাস্তুর চোখে দেখেছেন নাকি?

ঢোলবাবু বললেন, কী আশ্চর্য্য! আমার মেজো শালা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের প্রোফেসর, ওকে দেখেছি, মাইক্রোস্কোপ দিয়ে কেলাস বা ক্রিস্টাল বাছতে। অ, তার মানে পাস্তুর এসে এই ধারণাটাও ঢুকিয়েছিলেন!

বাকু বললে, তা একরকম পথপ্রদর্শক বলা যেতেই পারে। কিন্তু সেটাও বড়ো কথা নয়।

ঢোলবাবু বললেন, তালে বড়োকথাটা কি শুনি?

বাকু বললো, গবেষণাপত্র লিখে দাবী করলেই হলো না, সেকালে সরাসরি সামনে বসে পরীক্ষা দেবার রেয়াজ ছিল। ইউরোপের বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানী ছিলেন বৃদ্ধ জঁ ব্যাপ্তিস্ত বিও। সে কালে তাঁকে সবাই বেশ মান্যিগণ্যি করতো। বুড়ো বললে, তুমি বললেই তো মানবো না খোকা, একদিন আমার ল্যাবে এসে, আমার বিকারক আর যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করে, আমার সামনে পরীক্ষে করে প্রমাণ দাও, যে কেন এই দুই জায়গা থেকে পাওয়া টার্ট্রেট লবণের এই দুইরকম আচরণ!

লুইঠাকুর বললে, বেশ, আপনার ল্যাবে বসেই পরীক্ষা করে এটা প্রমাণ করবো।

এখানে একটা গভীর অনুভবের ব্যাপার আছে ঢোলগোবিন্দবাবু। শুধু যদি গড়পড়তা গোঁড়া বিজ্ঞানীর মত যুক্তি চাই, সিদ্ধান্ত চাই, অঙ্ক চাই, তিনবার করে করতেই হবে এরকম কাঠখোট্টা পরীক্ষা চাই, এসব বলে পাস্তুর চ্যাঁচাতেন তবে বিষয়টার কোনকালে সুরাহা হত না, আর না হলে আপনারা মানুষেরা যে কিভাবে বাঁচতেন, তা ভাবতেই ভয় লাগছে। আসলে লুই পাস্তুরের ছিল শিল্পীর মত চোখ। দুচোখ ভরে কেলাস বা ক্রিস্টালের ছাঁদ দেখতেন আর মুগ্ধ হয়ে যেতেন। পর্যবেক্ষণ যে এত নিপুণভাবে কেউ করতে পারে, তা রসায়নের লোকে আগে জানতো না! কেলাসকে সূক্ষ্মভাবে দেখতে হলে লাগবে মাইক্রোস্কোপ। তারপর চোখ ঠিকরে সূক্ষ্ম তুলি দিয়ে বেছে বেছে আলাদা করো একেকটা কেলাস, দ্যাখো তারা কেমন আকারের, জ্যামিতি কিরকম। ঢোলগোবিন্দবাবু, ইলিশের কাঁটা বাছতেই কেমন বিরক্ত হই, তাও ইলিশ খাওয়ার জিনিস, আর এ তো স্রেফ কেলাস! তাও মাইক্রোস্কোপে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে!

ঢোলবাবু বললেন, সত্যি বাকু, দেখার চোখ চাই, সাথে চাই ধৈর্য্য।

বাকু বলে, ধয্যি বলে ধয্যি! একবার নিজে প্রমাণ করো রে, তার পর লোকের সামনে প্রমাণ করো রে! পাস্তুর দেখলেন ও দেখালেন, আলোকসক্রিয় টার্ট্রেট, যেটা কিনা দক্ষিণাবর্তী, সেটার কেলাসগুলো সব একরকমের জ্যামিতিক আকারবিশিষ্ট।

অন্যদিকে, আলোকনিষ্ক্রিয় টার্ট্রেটগুঁড়ো, যেগুলো ল্যাবরেটরিতে বিক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরী করা, সেগুলো খানিকটা নিয়ে একরকম দ্রাবকে গুলে ঢাকনা দিয়ে ঢাকা দিয়ে রাখলেন বিও বুড়োর সামনে। কদিন পরে এসে দেখবেন দ্রবণ বাষ্পীভূত হয়ে কেলাসগুলো কেমন তৈরী হয়েছে।

নির্দিষ্ট দিনে পাস্তুর হাজির বিওর ল্যাবে। আলোকনিষ্ক্রিয় টার্ট্রেট কেলাসগুলো আলাদা করে মাইক্রোস্কোপে দেখলেন, বিজ্ঞানী বিও কে দেখালেন। দেখা গেল কেলাসগুলো দুরকমের! তার মধ্যে একরকমের কেলাসের ছাঁদ ঐ আলোকসক্রিয় কেলাসের ছাঁদের সাথে হুব্বোহু এক! ম্যাজিক!

এই অব্দি শুনে ঢোলবাবু বাগড়া দিলেন, তা কি করে হয় বাকু? একইরকম জিনিসের দুরকম কেলাস!

বাকু বললো, তা হলে আর বলছি কি কাকা! শুধু কি তাই? পাস্তুর এটাও দেখলেন ও দেখালেন যে একরকমের কেলাসকে আয়নায় ধরলে যেরকম দেখতে লাগে, আরেকরকমের কেলাস হুবহু সেইরকম!

ঢোলগোবিন্দ বললেন, আয়নায় তো সব একরকমই লাগে, এতে আশ্চয্যির কী আছে?

বাকু বললে, সে না হয় ফুটবলটাকে আয়নায় ধরলে তার ছায়াটা একরকমই লাগবে, কিন্তু ধরুন আপনার হাতের তালু মেলে ধরলেন, সেক্ষেত্রে সেটা নিশ্চয় আয়নায় উল্টো দেখাবে?

ঢোলবাবু হাত নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে ভাবতে লাগলেন, ঠিকই তো! আয়নার হাতের ছায়াটাকে নিয়ে সত্যি হাতের উপর ফেললে কিছুতেই আঙুলে আঙুলে মেলে না! এরকম তো কত জিনিসই আছে হে, তিনি বলেন, ডান হাতের দস্তানা বাঁহাতে পরা যায় না।

বাকু বললো, আজ্ঞে ক্রিস্টালগুলোও ওমনি দেখতে লাগছিল, তালেই বুজুন, দুইরকমের আয়নাতুতো ভাইকে আলাদা করে বাছা কী সাংঘাতিক চাপের ব্যাপার! পাস্তুর মাইক্রোস্কোপে চোখ ঠিকরে তাকিয়ে তুলি দিয়ে তুলে তুলে দুইরকমের কেলাস আলাদা করলেন। কত ঘন্টা কাটলো এভাবে তা কেউ লিখে যায় নি বটে।

ঢোলবাবু চুপ। ধৈর্য্য গুণ বড়ো গুণ। সব বিজ্ঞানীর ধৈর্য্য থাকে না, তাই সব বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর হন না। এটা অনুভব করে মনটা উদাস হয়ে গেলো। কুড়ি বছর সংসার করেও তিনি সুরোবালার মুড়োঝাঁটা খেয়ে ধৈর্য্য হারাচ্ছেন, এ অতি অন্যায়! নূতন করে ভাবতে হবে এটা নিয়ে।

বাকু বললো, আমি যা বলছি এসব নিজের চোখে আর দেখা হল কই, বাপঠাকুর্দার নিউক্লিয়াসে এই কাহিনী কতকাল ধরে শুনে আসছি, তাই আপনাকে বলতে পারছি! দুইরকমের ক্রিস্টাল বেছে বুছে বুড়ো বিয়োকে দেখাতে হবে, কোনটার অ্যাক্টিভিটি কিরকম!

জঁ ব্যাপ্তিস্ত বিও যখন নিজের ল্যাবরেটরিতে বসে নিজের চোখে দেখলেন, একরকম ক্রিস্টাল সমবর্তিত আলোর সমতলকে বাঁদিকে ১২ ডিগ্রি ঘোরালে, আরেকরকম ক্রিস্টাল সেটাকে ডানদিকে ১২ ডিগ্রি ঘোরাচ্ছে, তখন আনন্দে লাফিয়ে উঠে আমাদের লুইবাবাকে বললেন, করেছো কী খোকা, করেছো কী? এর মানে একরকমের কেলাসের কম্ম অন্যরকম কেলাসে এক্কেবারে ভন্ডুল করে দিচ্ছে?? এই তালে ল্যাবরেটরিতে তৈরী টার্ট্রেটের আলোকনিষ্ক্রিয়তার রহস্য! এ তো দুনিয়ার আশ্চর্যতম ব্যাপার, প্রাকৃতিক টার্টারিক অ্যাসিডের কেলাস তো এদ্দিন শুধুই ডানহাতি বলে জানা ছিল হে! বাঁহাতি মানে লিভোরোটেটরি কেলাস বলে তো কিছুই জানা ছিল না, খোকা লুই পাস্তুর, এ যে আবিষ্কার! খোকা, আমি সারাজীবন বিজ্ঞানকে এমন ভালোবেসেছি যে এটা দেখে আমার আনন্দ আর আঁটছেনা, তুমি খানিকটা নিয়ে রাখো!

ঢোলবাবু চোখ পাকালেন, এটা লাস্টে গুল দিলে বাকু?

বাকু খানিক থতমত খেয়ে বললে, এরকমই কিছু বলেছিলো বটে বুড়ো, আসলে হাওয়ায় ভাসলে ঠিক শোনা যায় না, তারপরে অ্যাতোলক্ষকোটি জেনারেশন পেরিয়ে গেছে আমাদের, একটু জল মেশানো থাকবেই! কিন্তু লুইবাবা এরপরে যা বাণী দিয়ে গেলেন, তা শুনে সবার আক্কেল গেল আরো গুড়ুম হয়ে! তিনি বললেন, আয়নাতুতো কেলাসগুলো যেসব অণু দিয়ে তৈরী, তারাও আয়নাতুতো! বোঝো কান্ড কাকা, জৈব অণুতে যে কার্বন পরমাণু থাকে তার চারটে হাত কিভাবে থাকে তাই নিয়ে তখন থিওরিরা মারামারি করছে, তখন সেই বাজারে লুইবাবা বলে দিলেন, টার্টারিক অ্যাসিডের দুরকম অণু, আর তারা হলো আয়নাতুতো অণু, আর তারা তৈরী করে আয়নাতুতো কেলাস! অবিশ্যি সব আয়নাতুতো অণু যে এরোম আয়নাতুতো কেলাস তৈরী করবে তার গেরিন্টি নাই, সেইজন্য বাকি হিংসুটে লোক বলে বেড়াতে লাগলো, “হুঁঃ, ওরোম আয়নাতুতো কেলাস না জমলে পাস্তুর আর রহস্যভেদ করতে পারতো না, ভাগ্যের জোরে কেলাস সেদিন ওমনি জমেছিল!” তখন আমাদের বাবা গম্ভীর হয়ে বাণী দিলেন, In the field of observations, chance favours the prepared mind!

Mind it! আয়নাতুতো অণুগুলো ঠিক মোজা আর দস্তানার মতো, ডানহাতি অণুগুলো কিছুতেই বাঁহাতি অণুগুলোর সাথে মিলবে না, বাকি সব মিলবে, কটা পরমাণু, কটা বন্ধনী এইসব একরকমের, শুধু পরমাণুগুলো এমনিভাবে সাজিয়ে অণু তৈরী হয়েছে যে দুইরকমের অণু যেন আয়নাতুতো যমজ! হাতকে গ্রীক ভাষায় যা বলে, তার সাথে মিল রেখে এই ঘটনাকে বলে কাইরালিটি আর আয়নাতুতো অণুদের বলে কাইরাল অণু। বিখ্যাত বাঙালি এঞ্জিনিয়ার তথা বিজ্ঞানসাংবাদিক শ্রী সুজিত কুমার নাহাকে চেনেন, ঢোলবাবু?

আরে বিলক্ষণ, ঢোলবাবু বলে ওঠেন, ওনার লেখা বই না পড়লে টেঁপির কি আর বিজ্ঞানে আগ্রহ জন্মাতো? তা হঠাত্ তাঁর নাম নিলে, বাকু?

বাকু বললে, কাইরালিটির বাংলা পরিভাষা এনারই উদ্ভাবিত। সেটা হল, ভুজধর্মিতা, ইনজিরি handedness এর সুন্দর বাংলা। ভুজধর্মী হতে পারে দস্তানা, মোজা, হাত, পা, কেলাস এইসবই, কিন্তু জৈব অণু যে ভুজধর্মিতা দেখায় সেটা পাস্তুর প্রথম ধারণা দিয়ে যান। আর তার বছর দশেক পরে মদ পচে টক ভিনিগার কেন হচ্ছে তার কারণ বার করতে গিয়ে পাস্তুর দেখবেন ও দেখাবেন, কেবল আঙুরের মদের ডানহাতি টার্টারিক অ্যাসিড খালি পচে, বাঁহাতি টার্টারিক অ্যাসিড পচে না! তখন সরেজমিনে তদন্ত করতে গিয়ে ধরা পড়লো আমাদের জ্ঞাতিগুষ্টি মাইকোব্যাকটিরিয়াম অ্যাসেটি, আসামী। সে ব্যাটারা যে উত্সেচক বার করে সেটা কেবল ডানহাতি অণুগুলোকেই ভাঙতে পারে, বাঁহাতি গুলোকে পারে না! তারপর নির্দিষ্ট উষ্ণতায় এমন করে মদ ফুটিয়ে জীবাণুগুলোকে মেরে দিলে গা, যে আর কোনোদিনো…...ও পিসি, ও ঠাকুমা, ও অ্যাসেটি, ও টিউবারকুলোসিসের দাদু গো….

ল্যাকটোব্যাসিলাসটা নিউক্লিয়াস হাঁ করে কাঁদছে দেখে ঢোলবাবুর ভারী মায়া হলো, ওর সাইটোপ্লাজমটায় একটু চুমু খেয়ে তিনি বললেন, ষাট ষাট, কাঁদে না বাকু! তোরা তো খুব তাড়াতাড়ি বাড়িস! চিন্তে করিস না রে, ওঠ ওঠ, মাইটোকনড্রিয়নটা মোছ, আসলে এসব শুনিয়ে লুইবাবার মেসেজ টেসেজ কিছু বলবিনে বুঝি?

বাকু মাইটোকনড্রিয়নটা মুছে টুছে বললো, আপনি মেসেজটা বুঝতে পারেন নি, একটুও?

ঢোলগোবিন্দবাবু বললেন, ভাসা ভাসা আর কি! ওই সংসারে শান্তিতে টিকতে গেলে ধৈর্য্য ধরে থেকে অনুরাগী আর বদরাগী পার্টনারের কেলাস আলাদা করে ফেলতে হবে। আমি যেন সমবর্তনের সমতল, যখন যেদিকে ঘোরায় ঘুরে যাব, এই তো? নো দুঃখ, নো সুখ সবই আয়নাতুতো ছায়ামাত্র। আহা, জয়, লুই বাবার জয়! জয়, শ্রীপাস্তুরের জয়!

বাকু অর্থাত্ ল্যাকটোব্যাসিলাসটা চোখের মত দেখতে মাইটোকনড্রিয়নটা একবার মটকে সম্মতি জানিয়ে হাওয়ায় গা ভাসিয়ে দিলো।

রান্নাঘর থেকে ভেসে এলো সুরোবালার সুরেলা কন্ঠস্বর, হতভাগা, খালি পড়ে পড়ে ঘুম দিচ্চে, আমার হাড়মাস জুড়িয়ে কালি করে দিলে গা! টেঁপি, অ্যাই টেঁপি, তোর বাপকে চান কর্তে যেতে বল্! বল্, রান্না অনেক্ষণ হয়ে গেচে!

*********
© শ্রুতিসৌরভ বন্দ্যোপাধ্যায়